নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামায় চাক এবং ম্রো গ্রাম উচ্ছেদ বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন

তদন্ত: ১৪১৬জুন২০১৩

……………………………………..

নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামায় চাক এবং ম্রো গ্রাম উচ্ছেদ বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন-উত্তর

নাগরিক প্রতিনিধিদল কর্তৃক আয়োজিত

সংবাদ সম্মেলন

১৯ জুন ২০১৩, বুধবার, সকাল ১১টা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেগুনবাগিচা, ঢাকা

 

প্রিয় গণমাধ্যম কর্মীবৃন্দ

শুভেচ্ছা জানবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের গণমানুষের সুখ-দুঃখ, কষ্ট-গ্লানি, হাসি-কান্নার যাবতীয় বিষয়াবলী আপনাদের আনন্দে বিহবল বা বেদনায় বিচলিত করে বলেই আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের বোধ ও বোধি থেকে আপনাদের অনূভূতির প্রকৃতি ও প্রকরণ ভিন্ন এবং অনন্য। আমরা আজ তাই আপনাদের সম্মুখে হাজির হয়েছিÑÑ আমাদের কিছু দেখা, কিছু শোনা, ও কতকটা অভিজ্ঞতা বিনিময় করবার জন্য; যদিও এ অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয় কিন্তু আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস সমস্যার স্বরূপ উদঘাটন ও এর প্রকাশ বা প্রচারে আপনাদের সহায়ক ভূমিকা পালন জাতিকে আশার আলো দেখাতে সচেষ্ট হবে।

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সুষমার আধার হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। স্বকীয় ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পাহাড়ী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত আদিবাসী জনগণ যেন পুরো বাংলার সৌন্দর্যের নিরাভরণ অলংকার। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবান হলো ঘন অরণ্যের নিশ্চুপ পরিবেশের সারি সারি পাহাড়ের সংগম সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এ জেলার দূর্গম ও দূরবর্তী একটি উপজেলার নাম নাইক্ষ্যংছড়ি। এর পাঁচটি মৌজা ঈদগড়, আলেখ্যং, বাইসারী, বাকখালী ও কোয়াংঝিরিতে বাস করে মারমা, চাক, মুরং, ত্রিপুরা, চাকমাসহ বাঙালী হিন্দু ও মুসলমানদের দুই হাজার পরিবারÑ যেখানে আদিবাসী পরিবারের সংখ্যা প্রায় সাতশ। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে গত মার্চ মাসের ১৩ তারিখে বাদোঝিরিতে (আলেখ্যং মৌজা) সর্বমোট ২১ টি চাক পরিবারের প্রায় সবকটি উচ্ছেদ হবার ঘটনায় আমরা উৎকণ্ঠিত হই এবং উদ্বেগাকুল হয়ে উঠি। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বিভিন্ন গণ-মাধ্যমের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল গত ১৪ জুন ২০১৩ নাইক্ষ্যংছড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হই। ১৫ জুন প্রতিনিধিদল ভুক্তভোগী জনগণের সাথে মতবিনিময় করে। আমরা উচ্ছেদকৃত বাদোঝিরির চাক পরিবারের মানবেতর জীবন প্রত্যক্ষ করি, পাশের বাইসারীতে আশ্রয় গ্রহণকারী এসকল মানুষের সাথে কথা বলি, স্থানীয় গণ্যমান্য, অভিযুক্ত, পুলিশ, সাধারণ মানুষের বক্তব্য নিই। ১৬ জুন রবিবার বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, বান্দরবান জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করা হয়।  এছাড়াও প্রতিনিধিদল চাকমা সার্কেল চীফ ও বোমাং সার্কেল চীফ-এর সাথেও সাক্ষাৎ করেন। এই বিষয়গুলোর আলোকে নাগরিক প্রতিনিধিদলের পর্যবেক্ষণ আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরছি।

প্রিয় বন্ধুরা

আপনারা জানেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ব্রিটিশ আমল থেকে বারবার উচ্ছেদ হয়েছেন। প্রথমে ১৮৮০ এর দশকে সংরক্ষিত বনভূমি স্থাপনের নামে প্রথম উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তারপর ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সময়। পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৮০ দশক থেকে কয়েক বছর ধরে বাঙালি পুনর্বাসন কার্যক্রমের ফলে হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার নিজ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হন। ভূমি হারানোর এই বেদনার ক্ষত এখনও আদিবাসীদের জীবনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

তাই বাদোঝিরির ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গোটা পার্বত্য অঞ্চলের সমগ্রকের একটি প্রতীকী নমুনায়ন মাত্র। অর্থাৎ পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষ, লোকচক্ষুর সামনে অথবা আড়ালে আদিবাসী উচ্ছেদের যে নির্মম ঘটনাবলী ঘটছে বাদোঝিরির ২১টি চাক পরিবার উচ্ছেদ তার মধ্যে সর্বশেষ একটি করুণ চিত্রের সংযোজন। যদিও লামায় সরই ইউনিয়নের লুলাইং এলাকার ২১০টি ম্রো পরিবার নানাবিধ হুমকি-ধামকির মধ্যে ভয়াবহ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।

২১টি চাক পরিবার আমাদের (নাগরিক প্রতিনিধি দল) মুখ্য পরিদর্শন উদ্দেশ্য হওয়ায় এসকল সমস্যা সমাধানে বাস্তব কার্যকর ভূমিকা নেয়ার সুপারিশই আমাদের আজকের আলোচ্য।

বাদোঝিরির উচ্ছেদকৃত চাক পরিবারে সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের বাইসারী মৌজায়। আগে জুম চাষ করে জীবন কাটত। কিন্তু পথে ডাকাতির কবলে পড়ে বাজার সওদা খুইয়ে ফেলা ছিল নিত্য- নৈমিত্ত্য। হঠাৎ ১ মার্চ তাদের বাড়িতে গণডাকাতি হয়। আতঙ্কিত হয়ে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে পাশে বাইসারীতে পালিয়ে আসে।

কিন্তু প্রশ্ন জাগেÑ বাজার সওদা লুট বা বাড়িতে গণডাকাতি কে বা কারা করে এবং কেন-ই বা করে? কী আছে এ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাধারণ চাক পরিবারেরÑ যে ডাকাতি করে অনেক আয় হবে? কারাই বা তাদের পাশাপাশি বাস করেÑকেউ না। তাহলে, ব্যাখ্যা করা যাক। তাদের পাশে অবস্থান করে সারি সারি বৃহৎ রাবার বাগান। বাগানগুলোর মালিক স্থানীয় কেউ নন। ঘন জঙ্গলের মধ্যে সেখানে স্বাভাবিক যান চলাচল করে না, দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয় পায়ে হেটে বা ভাড়ায় চালিত মোটর বাইকে । সেখানে হাজার একর জায়গা দখল করে বাগান করেছেন কারা? কথা বলে যাদেও নাম শুনেছিÑ তারা সমাজের বিত্তশালী শুধু নন প্রভাবশালীও বটে। রাজনীতিক মির্জা আব্বাস, চিত্রনায়ক সোহেল রানা, চঐচÑর সূফী মিজানুর রহমান, টঈইখ-এর জাফর আহমেদ চৌধুরী, দুর্নীতি দমন কমিটির নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলার সভাপতি শাহ সিরাজুর রহমান সেলিম, কাবিল হোসেন, হুমায়ুন কবীর, অ্যাডভোকেট দুলাল এবং আরও অনেকে। মেরিডিয়ান বা পিএইচপি’র বুলু বা কবীর কোম্পানীর রাবার বাগান ক্রমশঃ বিস্তৃতি লাভ করছে। এভাবে রাবার বাগান বাড়ে তো পাহাড়ী মানুষের আবাসস্থল কমে। ঘটনা ব্যাস্তানুপাতিক। তাই রাবার বাগান বৃদ্ধি পেলে জুমের জমিও কমে। দীর্ঘদিনের জীবন জীবিকা থেকে সটকে পড়তে হয় তাদেরÑপাহাড়ীদের। কাজ করে খেতে হয় রাবার বাগানে। দিন মজুরের একাজ আবার প্রত্যেক দিনেরও নয়, প্রত্যেক পাহাড়ীরও নয়। বাঙালিও তো ঘাটি গেড়েছে প্রচুর। কাজেই একদিকে আশ্রয়হীন এসকল আদিবাসী মানুষ অন্নহীন জীবন কাটায়Ñ চিকিৎসাহীন তো বটেই। রাষ্ট্রের অমনোযোগে শিক্ষা তো তাদের দূর নাগাল। সে যা হোক, কথা হচ্ছিল রাবার বাগান নিয়ে। বাগান বাড়ছে। কিন্তু কীভাবে? কার জায়গা এগুলো? কে আসলে মালিক? কীভাবেই এগুলো দখল হচ্ছেÑযারা করছে তারা কি ভূমি দস্যু? নাকি টাকার লোভ তাদের এগুলো করাচ্ছে? এসব প্রশ্ন সাংবাদিক হিসেবে আপনাদের মনে আসছে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যা অভিযোগ পেলাম তা হলো আদিবাসী ও দূরবর্তী প্রভাবশালী বাগান মালিকদের আরও একটি চক্র সেখানে কাজ করছে। দোছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও দাগী আসামী ফারুক চেয়ারম্যান বাইসারীর অনেক জায়গা দখল করছেন। একটা পাঁচ ব্যক্তির সিন্ডিকেট আলম মাঝি, হাবিব মাঝি, (বাইসারী আ’লীগ সভাপতি), জাফর (শ্রমিক লীগ নেতা), আবদুল জবর ফরাজী (সাবেক মেম্বার) ও ইসহাক জমাদার (আগে বিএনপি এখন আ’লীগ নেতা)Ñ এসকল দখল কার্যাদির তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করেন। তাদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে সখ্যতা। এ সকল সিন্ডিকেটের সদস্যবৃন্দ নিজেরা এগুলো দখল করেছেনÑ এটা স্বীকার করেন না। আলম মাঝি বলেন, তারা হেডম্যান থেকে রিপোর্ট নেন এবং সেখানে চিকন পাতার বাগান করেন। তাহলে রিপোর্ট আসলে কী? প্রথানুযায়ী পার্বত্যাঞ্চলে কোন জমি ক্রয় করতে হলে অবশ্যই হেডম্যানের অনুমতি লাগবে। সার্কেল অনুযায়ী রাজাদের পরামর্শক্রমে হেডম্যান ও কারবারীরা কাজ করে থাকেন। কোনও কোনও হেডম্যানকে অর্থ বা মদের বিনিময়ে স্থানীয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা হয়তবা একটা রিপোর্টও সংগ্রহ করে নেন। একজন হেডম্যান কোনও পাহাড়ীকে পাঁচ একর জমি হস্তান্তর রিপোর্ট দিতে পারেন। যদিও ১৯৯৭ ও ২০০১ সালে সরকারী প্রশাসনের নোটিশ অনুযায়ী কোনও হেডম্যানকে এ ধরণের রিপোর্ট না দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তাহলে হেডম্যান রিপোর্ট কেন দেন? কারণ কিছু কিছূ হেডম্যানদের তেমন পড়াশুনা নাই। তাকে লোভ দেখানো হয়। কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য যে কোনো উপায়ে প্রলোভনের মাধ্যমে রিপোর্ট নেয়া হয়। পাঁচ একর জমিÑ পর্যায়ক্রমে হাজার একরের দখলী বাগানে পরিণত হয়। আশ্রয়হীন মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না, কোম্পানীর কাজ করতে হয়, যারা করেন না তারা ভোগান্তির শিকার হন। এ পাহাড় সে পাহাড়ের জুমিয়ারা হন অন্যের দাস। আগে যাদের ঘর ছিল শক্ত কাঠের, আজ তারা ঘর ভাঙ্গলে কাঠ পায় না। সংগ্রহ করার জুম বাগান অথবা বনানী এখন সংকুচিত। রাবার বাগানের মাসিক বেতন ৩৫০০ টাকা, যা দিয়ে কাঠ কিনতে হয়, কিনতে হয় খাবার। বাইসারী থানার এস আই আবদুল হান্নান গত ১৩ মার্চ  বাদোঝিরির ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। স্থানীয় ইউএনও প্রত্যেক পরিবারকে এক বা-িল টিন, ৩০ কেজি চাল ও ছয় হাজার টাকা করে অর্থ সাহায্য বিতরণ করেছেন। কিন্তু তাদের পুনর্বাসন? জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন যে তিনি এ বিষয়ে অবগত আছেন এবং ব্যবস্থা নিবেন। তার মতে, বর্ষার কারণে ১৪ টি পরিবার এখন বাদোঝিরিতে যেতে চাচ্ছেন না, তবে শীতকালে যাবেন। কিন্তু ভিকটিমরা আমাদেরকে তাদের আশঙ্কার কথা পুর্নব্যক্ত করেছেন। নিরাপত্তার বিষয়টিই তাদের কাছে মূখ্যÑ কে তাদের নিরাপত্তা দেবে?

বন্ধুরা

১৪ পরিবার ও ২১ পরিবার কোনও তথ্য বিভ্রান্তি নয়। গত চার বছর ধরে এ উচ্ছেদ চলছে এবং ১৩ মার্চÑ একসাথে বাকী ১৪ পরিবার বাদোঝিরি ছেড়ে বাইমারীতে আত্মীয়দেরে কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। তাহলে আমাদের পর্যালোচনা হলো এই যে, যদি হেডম্যানের রিপোর্ট না দেয়ার নির্দেশনা থাকেÑ তো এ রিপোর্ট দেয়া না দেয়ায় কী কি এসে যায়? এর তো কোনো বৈধতাই নেই। তাহলে এ রিপোর্ট নেয়াই বা কেন? কারণ এটা জমি দখলে  জন্য একটি অবৈধ কৌশলী হাতিয়ার। আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে এ জমি আমার। এ ডকুমেন্ট আবার হাত বদল হয়। মধ্যস্বত্বভোগী এ থেকে চরম ব্যবসা করে। দখলদারদের সাথে কিছু পাহাড়ীরা যোগ দেয়। তাদেরকে জুমের সব টাকা দেয়ার লোভ দেখানো হয়। কেউ ২৫ একর জমির লীজ নেয়, তারপর ফেলে রাখে। ক্রমান্বয়ে ৫০০ একর জমি দখল করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়। ভূমির ডকুমেন্ট অবৈধ জেনেও প্রশাসন মামলা আমলে নেন বলে জানিয়েছেন বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা। তার মতে, কারও কাছে ডকুমেন্ট আছে, কারও কাছে নেই। কাজেই বিচারাধীন মামলার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত যার হাতে ডকুমেন্ট আছে সেই জমি দখলে রাখে। জমি দখলের এ প্রক্রিয়ায় মামলা একটি কৌশলমাত্র।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক কে এম তরিকুল ইসলামের মতে, ২০০১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে বন্দোবস্ত ও লীজ এর সকল কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। যখন লিজ দেয়া হয়েছিল তখন জমির তত কদর ছিল না। পাহাড়ীরা এ পাহাড় সে পাহাড় ঘুরত। জমি ছিল উন্মুক্ত ও অরক্ষিত। ২৫ একর করে জমি রাবার বাগানের জন্য দেয়ার সময় স্থানীয়রা তাই আবেদন করেনি। কিন্তু বিভিন্ন সামরিক ও সিভিল প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবীরা সে সুযোগটা নিয়েছে। যেহেতু তারা জানত যে এখানকার সম্ভাবনা কথা।

পরবর্তীতে বিভিন্ন রাবারচাষীদের নামে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ আসে। কেউ এফিডেভিটের মাধ্যমে কিনে নেয়Ñ কেউ আবার কিনল না, বললো যে আমাদের অনুকূলে দিয়ে দাও, যেমনÑ ডেসটিনি। যেহেতু রাবার চাষ লাভজনক- তারা ঝিরি পর্যন্ত পৌছে গেছে। অনেকেই হেডম্যানদের রিপোর্ট দেয়াকে অনৈতিক বললেও জেলা প্রশাসকের মতে, আলেখ্যং মৌজার দখলদারদের কাগজপত্র আছে। আলেখ্যং মৌজার হেডম্যানের নিয়োগকৃত এক বাঙালি মহুরী নানাভাবে হেডম্যানদের সাথে সিন্ডিকেটের একটা সম্পর্ক  তৈরী করে দেন। এভাবে ডকুমেন্ট হাস্তন্তরের মাধ্যমে কক্সবাজার থেকে নোটারী পাবলিক করানোর ব্যবস্থা করে থাকেন। তবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মতে, নোটারী পাবলিক হলো জমি দখলের জন্য একটি ব্যবস্থা।  যা অনৈতিক ও  পার্বত্য এলাকার আইনে অনুমেদিত নয়।

বোমাং সার্কেলের চীফ বোমাংগ্রী উচপ্রু এর মতে, সব জমি যদি লিজ আর রাবার বা তামাক চাষের জন্য বরাদ্দ হয় তাহলে জুমিয়ারা যাবে কোথায়? তার মতে সকল সেটেলম্যান্টের অধিকর্তা জেলা প্রশাসক। তাই প্রথাগত ভূমি অধিকারের প্রশ্নে সরকার, আঞ্চলিক পরিষদ, রাজা ও হেডম্যান কারবারীদের সমন্বয় থাকা উচিত। রাজা দেবাশীষ রায়ের মতে, হেডম্যান এসব কিছুর জন্য দায়ী নন। গোটা বিষয়টি হল নিরাপত্তার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা তো সরকারের দায়িত্ব। ওখানে নিরাপত্তা না থাকলে  তো যে কেউই জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ

পার্বত্য আলীকদম, লামা ও বান্দরবানের প্রত্যেকটি মেয়র বাঙালি। নাইক্ষ্যংছড়ির সবকটি ইউনিয়ন ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা বাঙালি। বাঙালি পাহাড়ী জনসংখ্যার অনুপাত শতকরা ৫৫: ৪৫। তাহলে আগামীতে পাহাড়ের প্রতিনিধিত্ব করবেন কারা?  নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামার পাহাড়ী পথে যেতে যতে সেখানকার আদিবাসী জনগণের বসতি আমরা দেখেনি। এমনকি লামা থেকে সরই ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ী পথের দু-পাশে জুমিয়া মানুষের বসতভিটা আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসেনি। সরই  থেকে লুলাইং এর আরও দুর্গম পথে যেতে দৃশ্যমান হয়েছে কোয়ানাটাম মেটডের বিশাল সাম্রাজ্যের। পাহাড়ের নতুন অধিপতি তো এখন তারা। পাহাড়ের ভূমিজ সন্তানরা আজ উধাও হয়ে যাচ্ছেন। প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতার পথে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রিয় জুমভূমি, তাদের প্রিয় পাহাড়ের জীবন। এইমতাবস্থায় প্রতিনিধি দল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের  নিকট কিছু সুপারিশমালা উত্থাপন করছেÑ

১)       পাহাড়ীরা নিরাপত্তাহীন হয়ে উচ্ছেদের শিকার হলেও বিতাড়নকারীরা বহাল তবিয়তে আবেদন এবং প্রটেকশন পাচ্ছেন! তাহলে নিরাপদ নির্বিঘœ স্বাধীন জীবন যাপনের জন্য পাহাড়ীদেরকেও প্রোটেকশন দেয়া হোক। সেই সাথে ভয়ভীতি প্রদর্শনকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করা হোক

২)       অবিলম্বে বাদোঝিরির উচ্ছেদকৃত ২১ পরিবারসহ অন্যান্যদের বাস্তুভিটা ফেরতসহ স্ব-স্থানে পুর্নবাসন করা হোক।

৩)       কারও সাথে আলোচনা না করে এভাবে জমির লীজ দেয়া ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক আচরণ। তাই যারা জমির ইজারা নিয়ে শর্ত লঙ্ঘন করেছে এবং অবৈধভাবে লীজ নিয়েছে তাদের ইজারা বাতিল করা হোক।

৪)       উচ্ছেদের শিকার প্রত্যেক আদিবাসী পরিবারকে পাঁচ একর করে জমি দিতে হবে যা শুধু অভ্যন্তরীণভাবে হস্তান্ত-রযোগ্য হবে।

৫)       তাদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ ও কার্যকরী শ্রম দেয়ার যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৬)       সর্বোপরি পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ৩০ জুন ২০১২ আন্তঃমন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংশোধনের কার্যকর উদ্যোগ (যদিও বিল আকারে সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায়) গ্রহণ করে পাহাড়ে ভূমি সমস্যার নিরসন করা হোক।

 

নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ: ১। পংকজ ভট্টাচার্য, সহ সভাপতি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, ২। অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ তালুকদার, সভাপতি, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ৩। নুমান আহমেদ খান, নির্বাহী পরিচালক, আইইডি, ৪। রাজীব মীর, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ৫। দীপায়ন খীসা, সদস্য, কাপেং ফাউন্ডেশন, ৬। ইয়াসমিন পিউ, প্রতিবেদক, দৈনিক ইত্তেফাক, ৭। ঝর্ণা মনি, প্রতিবেদক, দৈনিক ভোরের কাগজ, ৮। রাশেদ আলম, স্টাফ রিেেপার্টার, দৈনিক সংবাদ, ৯। উজ্জ্বল তংচঙ্গ্যা, দৈনিক সমকাল বান্দরবান, ১০। বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, দৈনিক প্রথম আলো, বান্দরবান, ১১। তানভীর আহমেদ, সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলামেইল২৪.কম, ১২। রিপন বানাই, সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, ১৩। তোফায়েল আহমেদ, কক্সবাজার এবং ১৪। অরুন বিকাশ দে, রিপোর্টার ডেইলি স্টার, চট্টগ্রাম ব্যুরো।